১৯৬০ সালে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বা পিল সহজলভ্য হওয়ার আগে কাউকে সন্তান নেওয়ার কারণ দর্শাতে হতো না। যৌনতার জৈবিক ও স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে সন্তান জন্মদানই ছিল প্রচলিত রীতি। তখন মানুষকে বরং সন্তান না নেওয়ার কারণগুলো নিয়েই ভাবতে হতো।
কিন্তু মাত্র দুই প্রজন্ম ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। এখন সন্তান না নেওয়াটাই যেন স্বাভাবিক বিষয় (ডিফল্ট) হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এখন আমাদের সন্তান নেওয়ার পেছনে ভালো কারণ খুঁজতে হয়।
সন্তান নেওয়ার পক্ষে মহৎ এবং ধর্মীয়-সামাজিক অনেক যুক্তি আছে। কিন্তু এর পেছনে কিছু ‘স্বার্থপর’ কারণও থাকা উচিত। কারণ দিনশেষে এগুলোই অনুপ্রেরণা হিসেবে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
আমি জানি, সন্তান নেওয়া কঠিন, ব্যয়বহুল, নারীদের জন্য অনেক ক্ষেত্রে অন্যায্য, পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টিকারী, আত্মকেন্দ্রিক এবং অনেকের কাছে অপছন্দনীয় বা অসম্ভব—এমন অনেক যুক্তি রয়েছে। আমি এগুলো অস্বীকার করছি না; এর কিছুটা সত্যিই যৌক্তিক। কিন্তু যেহেতু সন্তান না নেওয়াই এখন সাধারণ প্রবণতা, তাই এই দীর্ঘ নেতিবাচক তালিকা সর্বত্রই চোখে পড়ে।
আমি এখানে কেবল আমার দৃষ্টিতে ছয়টি ‘স্বার্থপর’ কারণ তুলে ধরছি, যা সিদ্ধান্ত নিতে আপনার কাজে লাগতে পারে।
১) মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার সেরা উপায়
পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আপনার মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার বা টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সন্তান নেওয়া। আপনার জীবনকালের পরেও নিজের প্রভাব বজায় রাখার এটি একটি নিশ্চিত পদ্ধতি। যদি মনে করেন আপনার মূল্যবোধগুলো ছড়িয়ে দেওয়া উচিত, তাহলে সন্তান নিন—যারা আবার নিজেদের সন্তান নেবে। তারা যে হুবহু আপনার মূল্যবোধই ধারণ করবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবু অন্য যে কারও চেয়ে তাদের কাছে পৌঁছানোর বা প্রভাবিত করার সম্ভাবনা অনেক বেশি। সাধারণ মানুষের জন্য বই লেখা বা কোনো ফাউন্ডেশন গড়ার চেয়ে সন্তান নেওয়া অনেক বেশি সহজ সাধ্য।
২) বিনোদনের সেরা মাধ্যম
যেকোনো স্ট্রিমিং সার্ভিসের চেয়ে সন্তানরা বিনোদনের অনেক ভালো উৎস। তারা যেসব প্রশ্ন করে, তাদের দুষ্টুমি, খেলাধুলা, তাদের সৃজনশীলতা—প্রতিদিন এসব দেখা হলো সেরা বিনোদন। তাদের সৃজনশীলতা প্রায়ই আপনাকে অনুপ্রেরণা জোগাবে। যদিও কখনও কখনও বিষয়টি নেতিবাচকও হতে পারে, তবু তারা কখনোই বিরক্তিকর নয় এবং সবসময় আপনার পাশেই থাকে।
৩) একটি শিশুকে স্বাবলম্বী করে তোলার তৃপ্তি
একটি অসহায় শিশুকে একজন সক্ষম ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মধ্যে এক গভীর ও আদিম আনন্দ রয়েছে। এটি স্পষ্ট যে, একা একা তারা বড় হতে পারে না। তাই শিক্ষক, প্রশিক্ষক, কোচ বা অভিভাবক হিসেবে আপনার ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্ভরতা থেকে যে বিশেষ বন্ধন তৈরি হয়, তা অনেক সময় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তবে বেশিরভাগ অভিভাবকের জন্যই এটি আনন্দের। দীর্ঘ সময় তারা আপনার ওপর নির্ভরশীল থাকে। আপনি যদি তাদের যথাযথ দেখাশোনা করেন, তবে এই দেওয়া ও সাহায্য করার সুফল বা পুরস্কার আপনিই পাবেন।
৪) ভালোবাসা ও একাত্মতার আদিম চাহিদা পূরণ
মানুষের মৌলিক চাহিদাই হলো অন্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়া বা ভালোবাসা পাওয়া। শৈশবের প্রথম দশকে আপনার সন্তানরা আপনাকে এমনভাবে ভালোবাসবে, যা প্রাপ্তবয়স্কদের জীবনে সচরাচর অনুভব করা যায় না। এই নিঃশর্ত ভালোবাসা এতটাই শক্তিশালী যে, মানুষ প্রায়ই এটি ধরে রাখতে নিজের জীবনও উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকে। এটি জীবনকে বদলে দেয়, এমনকি অভিভাবকদের আচরণ ও বিশ্বাস পর্যন্ত পরিবর্তন করে দিতে পারে। এতটা ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও প্রয়োজনীয়তা অনুভব করার আনন্দ জীবনে আর কোথাও পাওয়া যায় না।
৫) জন্মদানের অপূর্ব উপহার
যারা পৃথিবীতে এসেছে, জন্ম নেওয়ার পর তাদের অনুশোচনা করার নজির অত্যন্ত বিরল। তাই জন্মদান একটি বিশাল উপহার। একজন মানুষকে অস্তিত্বে এনে তাকে স্বাবলম্বী করতে পারার মধ্যে এক গভীর সাফল্য ও তৃপ্তি রয়েছে। নারীদের জন্য এই অলৌকিক ঘটনাটি বিশেষভাবে তৃপ্তিদায়ক। কারণ, শারীরিক যন্ত্রণার বিনিময়ে তারা প্রকৃতপক্ষে একটি নতুন প্রাণ বা জীবন দান করেন। পিতামাতার গৌরবের অনেকটাই এই বিশাল ও মূল্যবান উপহারে অংশ নেওয়ার মধ্যে নিহিত।
৬) আজীবনের সঙ্গী হিসেবে সন্তান
সব ঠিকঠাক থাকলে, কৈশোর পেরোনোর পর আপনার সন্তানরাই হবে আপনার আজীবনের বন্ধু। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা আপনাকে অবাক করতে থাকবে। কঠিন সময়ও আপনাদের সম্পর্ক ভাঙতে পারবে না। যখন তারা আপনার মতো সন্তান নেওয়ার বয়সে পৌঁছাবে, তখন তারা শুধু সন্তান নয়, বিশেষ ও অনন্য মানুষে পরিণত হবে—যাদের এমন কিছু ক্ষমতা আছে যা আপনার নেই এবং যারা আপনাকে খুব ভালো চেনে। এমন মানুষ পাশে থাকা, যে আপনাকে এত ভালো জানে—তা এক গভীর আনন্দের বিষয়।
বয়স বাড়লে তারা হয়তো আসবাবপত্র সরিয়ে দিতে সাহায্য করবে, ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্টে নিয়ে যাবে এবং একসময় কোনো সাশ্রয়ী নার্সিং হোমে রাখার সিদ্ধান্তও তারাই নেবে—তারাই হবে আপনার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র।
অনেকে আরও কিছু স্বার্থপর কারণের কথা বলেন, যা আমার কাছে খুব একটা গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি, কিন্তু কারও কারও ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে। যেমন—কেউ কেউ বলেন, সন্তান নেওয়া হলো তাদের ব্যর্থ বা হারিয়ে যাওয়া শৈশব আবার ফিরে পাওয়ার উপায়। আবার কেউ বলেন, সন্তান নেওয়ার মাধ্যমে সমবয়সী বা পরিবারের কাছে গুরুত্ব বাড়ে।
সন্তান নেওয়া বিশ্বের জন্য কেন ভালো, তা নিয়ে অনেক যুক্তি আছে। কিন্তু এই তালিকাটি ভিন্ন—এটি পুরোপুরি আপনার ব্যক্তিগত উপকারিতার ওপর আলোকপাত করে।
আমি যদি কোনো কারণ বাদ দিয়ে থাকি, তবে জানাতে পারেন।