কে-পপ, কে-ড্রামা, কে-বিউটি আর কোরিয়ান খাবারের বিশ্বজুড়ে এখন জয়জয়কার। এসবের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নির্মিত হিট ছবি ‘কে-পপ ডেমন হান্টার্স’। তবে এই কোরিয়ান জোয়ার শুরুর অনেক আগে টরন্টোতে এক কিশোরী ছিলেন, যিনি তাঁর দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষককে মানচিত্রে কোরিয়া খুঁজে পেতে সাহায্য করেছিলেন। নেটফ্লিক্সের এই বিস্ময়কর ছবির পরিচালক ম্যাগি ক্যাং সেই স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমি ম্যাপে তাকে দেশটি দেখিয়ে দিয়েছিলাম। তিনি অবাক হয়েছিলেন যে চীন আর জাপানের মাঝে এমন একটি দেশ আছে, যা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না।” ম্যাগি যখন পাঁচ বছরের শিশু, তখন তাঁর পরিবার দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কানাডায় পাড়ি জমায়। “শিক্ষকের সেই অজ্ঞতা আমাকে চমকে দিয়েছিল। তবে এতে আমার কোরিয়ান হওয়ার গর্ব কমেনি, বরং আরও বেড়েছিল। আমি সবসময় ভাবতাম, এমন কিছু করব যা কোরিয়ান সংস্কৃতিকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরবে।”
তিন দশকেরও বেশি সময় পর সিউল থেকে ভিডিও কলে আমার সঙ্গে কথা বলছিলেন ম্যাগি। তিনি সদ্য দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সম্মানসূচক পদক গ্রহণ করেছেন—বিদেশে কোরিয়ান সংস্কৃতি প্রচারে অবদানের জন্য সরকার প্রদত্ত এই বিশেষ সম্মাননা। তাঁর ছবিতে ঐতিহ্যবাহী কোরিয়ান লোককথা আর আধুনিক পপ সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে। ছবির গল্পে গোপনে দানবদের সঙ্গে লড়াই করা গার্ল গ্রুপ ‘হান্ট্র/এক্স’ এবং দানব হয়ে ওঠা বয়ব্যান্ড ‘সাজা বয়েজ’-এর সংঘাত দেখানো হয়েছে। ম্যাগি আর ছবির আরেক পরিচালক ক্রিস অ্যাপেলহ্যান্স অত্যন্ত যত্ন নিয়ে সিনেমাটি তৈরি করেছেন। ছেলেদের বাথহাউসের গোপন আস্তানার রেট্রো রঙের প্যালেট ও টাইলসের নকশা থেকে শুরু করে মেয়েদের বেল্টে থাকা ‘নোরিগে’ বা রক্ষাকবচ—সবকিছুতেই দেশের ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁরা।
ছবিটির আবেদন ছিল সর্বজনীন। গত জুনে মুক্তির ১০ সপ্তাহের মধ্যেই ‘কে-পপ ডেমন হান্টার্স’ নেটফ্লিক্সের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দেখা ছবির তালিকায় জায়গা করে নেয়। জাতীয় জাদুঘরের পরিচালক ম্যাগিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন দর্শক বৃদ্ধির জন্য ধন্যবাদ জানাতে। ছবিটি দুটি ‘ক্রিটিকস চয়েস অ্যাওয়ার্ড’, দুটি ‘গোল্ডেন গ্লোব’ এবং ডাবল প্ল্যাটিনাম গান ‘গোল্ডেন’-এর জন্য একটি ‘গ্র্যামি’ জিতেছে। অস্কারে ছবিটি দুটি মনোনয়নও পেয়েছে। এক অবিশ্বাস্য মুহূর্তে—যা ম্যাগির ফোনকে মেসেজে ভাসিয়ে দিয়েছিল—‘জিমি কিমেল লাইভ’-এ জশ ব্রোলিন স্বীকার করেন যে ছবিটি দেখে তিনি কেঁদেছিলেন। ম্যাগি হেসে বলেন, “আমি তাঁর সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলতে চাই। কারণ থানোসকে (অ্যাভেঞ্জার্স সিনেমার ভিলেন) কাঁদানো আমার কল্পতেও ছিল না।”
ম্যাগি বড় হয়েছিলেন এক অপ্রত্যাশিত সাংস্কৃতিক দূত হিসেবে। কানাডায় বন্ধুদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলা সেই মেয়েটির কাছে মায়ের সঙ্গে কোরিয়ান পাঠ্যবই নিয়ে বিকেল কাটানো ছিল ভয়ের নাম। “আমি ওটা ঘৃণা করতাম! ওটা ছিল যন্ত্রণাদায়ক,” মা ক্যাথি ক্যাংয়ের চাপিয়ে দেওয়া পড়াশোনা নিয়ে বলছিলেন ম্যাগি। “কিন্তু এখন আমি সেই দিনগুলোর জন্য কৃতজ্ঞ। সম্প্রতি মায়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তিনি বললেন, ‘আমি জানতাম না তুমি কোরিয়ান সংস্কৃতির সঙ্গে এতটা মিশে আছো।’ আমি বললাম, ‘মা, তুমিই তো বলতে আমি কোরিয়ান আর এটা যেন কখনো না ভুলি।’”
সিনেমার প্রতি ভালোবাসা তিনি পেয়েছিলেন বাবা শন ক্যাংয়ের কাছ থেকে। তিনি ছিলেন এক কোরিয়ান প্রোডাকশন কোম্পানির কর্মকর্তা, যার ইতিহাস আর সিনেমার প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ। বাবা-মেয়ে মিলে অসংখ্য ছবি দেখেছেন—ওং কার ওয়াই থেকে স্পিলবার্গ, কুরোসাওয়া থেকে চার্লি চ্যাপলিন। যখন ম্যাগি নিজের গল্প লিখতে শুরু করলেন, বাবা তা খেয়াল করলেন। “এক বড়দিনের সকালে তিনি আমাকে একটি ডিজনি অ্যানিমেশনের বই উপহার দিলেন। আমি বুঝতে পারলাম, ওহ গড, আমি যেসব ছবি উপভোগ করছি সেগুলো আসলে মানুষেরই তৈরি।” তিনি বইয়ের ছবিগুলো আঁকতে শুরু করলেন এবং শেষ পর্যন্ত টরন্টোর বিখ্যাত শেরিডন কলেজে ভর্তি হন। স্নাতক শেষে ড্রিমওয়ার্কসে চাকরি পান, যেখানে তাঁর মেন্টর ছিলেন সেই ডিজনি বইয়ের শিল্পীরাই। সেখানে ‘ওভার দ্য হেজ’ আর ‘পাস ইন বুটস’ -এর মতো প্রকল্পে কাজ করতে করতে তিনি নিজের অবস্থান শক্ত করেন।
সেখানেই স্বামী ও সহকর্মী অ্যানিমেশন শিল্পী র্যাডফোর্ড সেক্রিস্টের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। তাঁরা প্রায়ই একসঙ্গে কাজ করেন, ‘কে-পপ ডেমন হান্টার্স’-এও করেছেন। সেক্রিস্ট তাদের পোষা বিড়াল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘ডার্পি টাইগার’ চরিত্রটি ডিজাইন করেছিলেন। ম্যাগি বলেন, “সেক্রিস্ট একজন দারুণ পরামর্শদাতা, আমরা একে অপরের কাজকে আরও উন্নত করি।” প্রায় এক দশক আগে এই দম্পতি সেক্রিস্টের স্কেট ক্রুর জন্য ‘রুমি’ চরিত্রটি ডিজাইন করেছিলেন। তখন ম্যাগি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন, আর নামটি তাঁর এত পছন্দ হয়েছিল যে মেয়ের নামও রাখেন রুমি। পরে ছবিটি তৈরি করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি সেই চরিত্রটিকেই গল্পের নায়িকা বানিয়ে দিলাম।”
সিনেমার চরিত্র রুমির বয়স ম্যাগির ৯ বছর বয়সী মেয়ের চেয়ে বেশি। এ কারণে একটি ভুল ধারণা আছে যে, ম্যাগি হয়তো বছরের পর বছর ধরে ছবিটি বানানোর চেষ্টা করছিলেন। আসলে প্রাথমিক ধারণা চূড়ান্ত করতে, প্রযোজক আকৃষ্ট করতে আর সনি পিকচার্স অ্যানিমেশনে বিক্রি করতে তাঁর মাত্র এক সপ্তাহ লেগেছিল। অ্যাপেলহ্যান্স শীঘ্রই লেখক আর সহ-পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। অ্যাপেলহ্যান্স বলেন, “সত্যি বলতে, আমাদের সৃজনশীলতার মিলটা ভয়ানক রকমের অদ্ভুত। আমরা দুজনই একই কারণে পরিচালনা শুরু করেছিলাম—ইন্ডাস্ট্রিতে যেসব ছবি দেখা যাচ্ছিল না, আমরা সেগুলোই বানাতে চেয়েছিলাম। সহকর্মী হিসেবে ম্যাগি কঠোর কিন্তু নিরহংকারী। ব্যক্তি হিসেবে ম্যাগি আসলে ছবির মেয়েগুলোর মতোই: বুদ্ধিমতী, মজাদার, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, ভোজনরসিক এবং ফ্যাশন-প্রেমী (আবার পাজামা-প্যান্ট পরতেও ভালোবাসেন)। একবার ম্যাগিকে চিনলে, পুরো ছবিজুড়েই তাঁকে খুঁজে পাবেন।”
ম্যাগি আর অ্যাপেলহ্যান্স কাজ শুরু করেছিলেন মেধাবী নারী ‘স্টোরি আর্টিস্ট’ বা গল্পকারদের নিয়ে, যাদের পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবিতে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তাঁদের আরেকটি লক্ষ্য ছিল: “অবশেষে অ্যানিমেশনে নারী চরিত্রদের সত্যিকারের দারুণ ফ্যাশন আর মেকআপ দেখানো,” বলেন ম্যাগি। “আমরা জিভাঞ্চি, আলেকজান্ডার ম্যাককুইন, জঁ পল গোলতিয়ের থেকে অনেক কিছু নিয়েছি। আর এডিটোরিয়াল ফ্যাশন ফটোগ্রাফির রঙের ব্যবহার দ্বারাও অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম।”
রুমির কণ্ঠ দেওয়া অভিনেত্রী আর্ডেন চো ম্যাগিকে এক আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ় পরিচালক হিসেবে বর্ণনা করেন। চো বলেন, “নারীদের জন্য কাজটা সব সময়ই কঠিন। তাই তাঁর পছন্দের জিনিসের জন্য তাঁকে লড়াই করতে দেখাটা সত্যিই দারুণ ছিল। আর অবশ্যই ছবির সাফল্য তাঁর সেই লড়াইকেই সার্থক প্রমাণ করে, বিশেষ করে ছবিতে বিশ্বাসযোগ্যতা ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে।” তবে ম্যাগি স্বীকার করেন, শুরুতে তাঁর ভয় ছিল। “দুই সংস্কৃতির মাঝে দোল খাওয়া নিয়ে আমি কখনো পরিচয় সংকটে ভুগিনি। কিন্তু এটা বানাতে গিয়ে প্রথমবার মনে হলো, আমি কি ঠিক করছি? বাবা আমাকে এই দ্বিধা থেকে বের করে আনলেন। তিনি বললেন, ‘পরিচালক হিসেবে তুমি শুধু নিজের সত্যটাকেই ছবিতে তুলে ধরতে পারো।’ এই কথাটি আমাকে মুক্তি দিয়েছিল।”
পেছন ফিরে তাকালে, ‘কে-পপ ডেমন হান্টার্স’ যে মানুষকে চমকে দেবে, তা খুব একটা অবাক করার মতো বিষয় নয়। এর মাধ্যম (অ্যানিমেশন), পটভূমি (কে-পপ), আর প্রাথমিক দর্শক (কিশোরী মেয়েরা)—এই তিনটি বিষয়ই তাদের বিশাল সাংস্কৃতিক প্রভাব সত্ত্বেও সচরাচর অবমূল্যায়িত হয়। কিন্তু ‘স্পাইডার-ভার্স’ ফ্র্যাঞ্চাইজির ধাত্রী সনি পিকচার্সে ম্যাগির প্রকল্পটি এমন একটি স্টুডিওতে ঠাঁই পেয়েছিল, যারা এশিয়ান দর্শকদের প্রত্যাশিত উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও পরিণত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করতে প্রস্তুত ছিল।
কোরিয়ান শামান বা ওঝাদের দ্বারা মন্দ আত্মার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ধারণাটি স্বাভাবিকভাবেই ‘ভেতরের দানব’ বা মনের রিপু অনুসন্ধানের দিকে মোড় নেয়। রুমির লজ্জা আর তা থেকে তৈরি হওয়া বিচ্ছিন্নতাবোধ দর্শকদের মনে শক্তিশালী দাগ কেটেছে। “আমি আমাদের মেয়েদের দ্বৈত জীবন দেখাতে পছন্দ করি,” যোগ করেন ম্যাগি। “কে-পপ তারকাদের জনসম্মখে ভাবমূর্তি বা ‘পাবলিক ইমেজ’ খুব যত্ন নিয়ে তৈরি করা হয়। আমরা মেয়েদের মেকআপ ছাড়া, পাজামা পরে, গভীর আবেগঘন মুহূর্তেও দেখাতে চেয়েছিলাম। সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে, আমি তরুণদের দেখাতে চেয়েছিলাম যে, এই চাকচিক্যের পেছনেও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা কিছু মানুষ আছে, যাদের ভুল-ত্রুটি থাকাই স্বাভাবিক।”
ম্যাগি জানান, তাঁর চরিত্রের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল সম্ভবত তীক্ষ্ণ মেজাজের ‘মিরা’র। তিনি বলেন, “বাইরে থেকে আমাকে একটু ঠান্ডা, গম্ভীর আর কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু আমি প্রচুর কাঁদি, আর খুব কম মানুষই সেটা দেখেছে। আসলে আমার মনটা খুব নরম।” যখন তিনি সব বর্ণের তরুণীদের রুমি, মিরা আর জোয়ি সেজে ভিডিও করতে দেখেন, তিনি বলেন, “আমি আবেগাপ্লুত না হয়ে পারি না। তারা বড় হয়ে তাদের সন্তানদের এই ছবি দেখাতে চাইবে, ঠিক যেমন আমার মেয়ে ‘মুলান’ বা ‘দ্য লিটল মারমেইড’ দেখেছে। এটা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে।”
ছবির একটি সিক্যুয়েল বা দ্বিতীয় পর্ব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে (“না হলে বাচ্চারা বিদ্রোহ করবে,” চো কৌতুক করে বলেন), কিন্তু এখন ম্যাগি বর্তমান মুহূর্তটিকেই উপভোগ করার চেষ্টা করছেন। “নব্বইয়ের দশকে বেড়ে ওঠার সময়, যখন শিক্ষক আমাদের দেশটাকে চিনতেন না, সহজ কথায়—আমি এক ধরনের হীনমন্যতায় ভুগতাম। ‘ইলচম ওসে’ (Ilchom ose)—অর্থাৎ আমার মতো দেড় প্রজন্মের (1.5 generation) অভিবাসীদের নিয়ে এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা প্রচলিত আছে। আমি আশা করি এই ছবির মাধ্যমে প্রবাসে বসবাসকারী কোরিয়ানরা দেখতে পাবে যে, আমাদের মধ্যেও এখনো শক্তিশালী কোরিয়ান সত্তা বেঁচে আছে। আমি গর্বিত যে আমি সেই সম্প্রদায়ের কণ্ঠস্বর হতে পেরেছি।”