skip to content

গুলবাহার

ক্যাফেতে একা বসার অসহনীয় আনন্দ

• ৭ মিনিট

ক্যাফেতে একা বসে থাকাটা বেশ স্ববিরোধী একটা ব্যাপার। এমনকি ক্যাফের অস্তিত্বের কারণটাই যেন এর সম্পূর্ণ বিপরীত।

ক্যাফেগুলোর জন্মই হয়েছে মূলত আড্ডা বা সাক্ষাতের জায়গা হিসেবে। এখানে একা বসার মতো একটা চেয়ারওয়ালা টেবিল খুঁজে পাওয়া বেশ মুশকিল। এমনকি জানালার পাশের উঁচু সিটিংয়ের টেবিলগুলোতেও বেশ কয়েকটা চেয়ার পাতা থাকে।

ক্যাফে হলো সামাজিক মেলামেশার জায়গা। বেশিরভাগ মানুষ এখানে আসেন প্রিয়জন, বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা করতে।

একা বসে থাকা মানুষ খুব একটা দেখা যায় না। যাদের দেখা যায়, তাদের বেশিরভাগই ল্যাপটপে মগ্ন। নিজের জগতে কাজ করে চলেছেন—সেটা যে জগতই হোক না কেন।

আমি অবশ্য এভাবে বসি না বললেই চলে।

কাজ থেকে ছুটি নেওয়ার পর আমি ‘স্টেইকেশন’ বা বাড়িতেই ছুটি কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার বেশিরভাগ বন্ধুর সিদ্ধান্তের বিপরীতে, যারা কি না ২০২৫ সালে জাপান ভ্রমণে গিয়েছিলেন।

তাদের অভিজ্ঞতার কথা শুনে আমার বেশ ঈর্ষা হলো। আর আমি যখন টানা চার সপ্তাহ ‘কিছু না করে’ কাটানোর পরিকল্পনার কথা জানালাম, তখন তারাও আমাকে ঈর্ষা করলেন।

ছুটির এই সময়টা যতটা সম্ভব ধীরলয়ে কাটাতে চেয়েছিলাম। কোথাও পড়েছিলাম, সময়কে থামিয়ে রাখার বা ধীর করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো কুকুর পালা। সৌভাগ্যক্রমে, আমার একটি কুকুর আছে। তাই তার সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে হাঁটাহাঁটি করলাম।

কাজের দিনে নাশতা আর দুপুরের খাবারের মাঝে যে সময়টুকু মাত্র ১০ মিনিট মনে হতো, ছুটিতে সেটাই যেন পুরো একটা দিন হয়ে উঠল। যদিও কুকুরকে হাঁটাতে তখন ৩০-৪০ মিনিটের তাড়াহুড়োর বদলে দুই ঘণ্টা লাগছিল; তবু মনে হচ্ছিল অনন্তকাল। এক শান্তির অনন্তকাল।

দ্বিতীয় দিন ফোনটা বাড়িতে রেখে বের হলাম, যাতে ওই দুই ঘণ্টা পূর্ণভাবে উপভোগ করতে পারি। ইন্টারনেট বা অন্য মানুষের সঙ্গে সংযোগ ঘটাতে পারে—এমন কিছুই সঙ্গে নিলাম না।

ভয় ভয় লাগছিল।

কিন্তু ৩০ মিনিট পর সব উদ্বেগ বাষ্প হয়ে উড়ে গেল।

এক কথায়, নিজেকে ভীষণ মুক্ত মনে হলো।

আসলে কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে না—এটাই মুক্তি নয়; বরং আমি কারো সঙ্গে বা কোনো কিছুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে ‘পারব না’—এই অক্ষমতাটুকুই ছিল আমার অস্থিরতার মূল কারণ।

কাউকে মেসেজ করার সুযোগ ছিল না। কিছু দেখা বা পড়ার উপায় ছিল না। কৌতূহল মেটানোর জন্য চট করে কিছু খোঁজারও কোনো সুযোগ ছিল না।

দীর্ঘদিন পর আমার মনটা একদম একা হয়ে গেল।

কৌতূহলবশত কিছু খোঁজার জন্য বেশ কয়েকবার পকেটে হাত দিয়েছিলাম। কিন্তু ফোন ছিল না।

প্রতিবারই নিজের বোকামিতে হাসলাম।

দ্বিতীয় দিন হঠাৎ পাড়ার এক ক্যাফেতে ঢুকে পড়লাম। অর্ডার দিলাম এক কাপ আমেরিকানো, সঙ্গে ডাবল শট এসপ্রেসো।

তাড়াহুড়ো করে মেট্রো ধরার সময় গরম আমেরিকানোতে চুমুক দেওয়ার ব্যাপারটা অন্যরকম। এর উদ্দেশ্য থাকে মূলত জেগে ওঠা। ওয়ান-টাইম কাপের ঢাকনার ছোট ছিদ্র দিয়ে চুমুক দিতে গিয়ে প্রতিবারই জিভ পুড়ে যায়। তখন নিজের ওপরই বিরক্তি আসে।

কিন্তু পোর্সেলিন কাপে সেই সমস্যা হয় না। তখন কফি পানের উদ্দেশ্যটাই বদলে যায়। এটা তখন একধরনের আনন্দে পরিণত হয়।

ঠিকঠাক কাপে আমেরিকানো নিয়ে বসলাম। কুকুরটা সুড়সুড় করে টেবিলের নিচে ঢুকে পড়ল।

টেবিলের নিচে কুকুর আর সঙ্গে কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস নেই—আমাকে বিরক্ত করার মতো কিছুই ছিল না।

আসলে কিসে বিরক্ত হতাম? মূলত কিছুতেই না।

সেখানে ছিল শুধুই অনাবিল আনন্দ। প্রতিটি উপাদানে। বরং বলা ভালো, কিছু উপাদানের অনুপস্থিতিতেই ছিল সেই আনন্দ। কোনো ফোন নেই। কোনো হেডফোন নেই। কোনো ট্যাবলেট নেই। কোনো ল্যাপটপ নেই।

ক্যাফের চারপাশের আলাপচারিতায় মন ভাসছিল। নিজেকে সেই স্রোতে ছেড়ে দিলাম।

চিন্তাকে যখন ডানা মেলতে দেওয়া হয়, তখন সেটা এমন এক যাত্রায় নিয়ে যায়—যা ভাবাই যায় না। জীবনের এই ইঁদুর-দৌড়ের মাঝে ছোট ছোট বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে থাকি। মাথায় আসতে থাকে সব ভুলের কথা। মেনে নিতে হয়—ব্যর্থতাগুলো আর বদলানো যাবে না, যতই অপরাধবোধ কাজ করুক না কেন।

তাই ওসব নিয়ে চিন্তা না করাই ভালো। বরং যেসব বিষয় পরিবর্তনযোগ্য, সেগুলোতে মনোযোগ দেওয়া উচিত—এখন কী করছি, পরে কী করব।

আর কিছু না।

পরদিন আবারও ফোন বাড়িতে রেখে একই ক্যাফেতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভাগ্য ভালো, একই টেবিলে বসতে পারলাম।

হাতে মনোযোগ সরানোর মতো কিছু না থাকলে, ক্যাফেতে একা বসে মানুষ সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। এই সেই মানুষ—যাদের আমরা বাড়ি থেকে কাজে, এক মিটিং থেকে অন্য মিটিংয়ে যাওয়ার তাড়াহুড়োয় এক সেকেন্ডে পাশ কাটিয়ে চলে যাই। সেই অদৃশ্য মানুষগুলোই হঠাৎ চোখের সামনে মূর্ত হয়ে ওঠে। মানুষ তখন আর দুই সেকেন্ডে মিলিয়ে যায় না। তারা থাকে। কফি খায়। অন্যদের সঙ্গে কথা বলে, হাসে, কাঁদে, চিন্তা করে। ওহ, চিন্তা!

চিন্তা শুধু চোখে দেখা যায়। চোখ হলো মনের আয়না। হৃদয়কে দেখতে হলে কান বন্ধ করে শুধু চোখের দিকে তাকাতে হয়।

চোখে চোখ রাখা বেশ অস্বস্তিকর—নিজের জন্যও, অন্যের জন্যও। আমরা সাধারণত চোখ এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দৃষ্টি বিনিময় হয়েই যায়—কারণ শারীরিকভাবে কেউ সরে যাচ্ছে না।

যেহেতু কেউ এক পলকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে না, তাই অন্য কিছুর দিকে তাকানোর ভান করি। তারা কথা চালিয়ে যায়। কিন্তু আমি তাদের চিন্তাগুলো দেখেছি, পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও বোঝার চেষ্টা করি।

একসময় অস্বস্তি এড়াতে ক্যাফে ছেড়ে চলে আসি।

পরদিন আবার গেলাম। এবার আমার টেবিলটা বেদখল হয়ে গেছে। কবে যে এটা ‘আমার টেবিল’ হয়ে উঠল, জানি না। কিন্তু তা-ই মনে হচ্ছিল। অগত্যা অন্য একটা টেবিল খুঁজে পেলাম। ক্যাফের কর্মীদের (স্টাফ) কাছাকাছি।

মনোযোগ ভটকায় এমন কিছু ছাড়া ক্যাফেতে একা বসলে বোঝা যায় একটা ক্যাফে আসলে কীভাবে চলে। বাস ধরার তাড়া নিয়ে কফির অপেক্ষায় থাকার সময় বিশাল কফি মেশিনের আড়ালে কী হয়, তা আমরা কখনো ভাবি না। ওয়ান-টাইম কাপে চুমুক দিয়ে জিভ পোড়ার সময় এসব চিন্তা করার সময় থাকে না।

দেখা যায়, কীভাবে কর্মীরা পোর্সেলিন কাপগুলো ঘোরায়, নোংরা থেকে পরিষ্কার করে, কফি মেশিনের ওপরে রাখে। প্রতিটি গ্রাহকের প্রতি কর্মীদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করি। তাদের কথোপকথন দেখে কে নিয়মিত গ্রাহক, তা বোঝার চেষ্টা করি।

ভাবি, আমাকেও কি ওরা নিয়মিত বলে মনে করে? গত কয়েকদিন ধরেই তো আসছি। নাকি ‘কুকুর নিয়ে আসা এক উদ্ভট লোক’ বলে ডাকে? জানব না কখনো। না জানাটাই বোধহয় ভালো।

নিজেকে কথা দিই, পরদিন আবার আসব শুধু কর্মীরা কীভাবে কথা বলে তা দেখার জন্য।

আবার একই ক্যাফেতে গেলাম। দুর্ভাগ্য, ওইদিন ভিন্ন শিফটের কর্মীরা কাজ করছিলেন। তবু একই অর্ডার দিলাম—এক কাপ আমেরিকানো, ডাবল শট এসপ্রেসো দিয়ে।

কোনো পিছুটান ছাড়া, টেবিলের নিচে কুকুর নিয়ে ক্যাফেতে একা বসলে একটা সত্য খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে—আপনি যা-ই করুন না কেন, অন্য মানুষের চিন্তা ও অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করতে পারবেন না। ক্যাফের কর্মীরা আপনাকে ‘কুকুর নিয়ে আসা উদ্ভট লোক’ ভাবতেই পারে; বন্ধুরা আপনার জায়গায় ঘুরতে যেতে চাইতে পারে; পরিবার আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে উদ্বিগ্ন হতে পারে।

জানেন তো, নিজেকে না বদলালে এগুলোর কিছুই বদলানো যায় না। তখন খুব একা ও অসহায় বোধ হয়।

একা ও অসহায়। এক গভীর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়।

পরদিন আর ক্যাফেতে গেলাম না। পরিবর্তে আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিলাম হেঁটে। তার পরদিন গেলাম, কারণ বুঝতে পারলাম—সেই দীর্ঘ হাঁটার পথেই আমি আসল চ্যালেঞ্জটার মুখোমুখি হয়েছি।

হাতে কোনো ডিভাইস বা কাজ ছাড়া ক্যাফেতে একা বসলে সবাই বুঝতে পারে আপনি একা।

এটা একান্তই একা করার মতো কাজ।

ভীতিকর, কিন্তু শক্তিশালী।

অনেকে এটা সর্বাত্মকভাবে এড়িয়ে চলেন। তাই সবাই অবাক চোখে তাকায়। তারা আপনার এই শক্তিশালী আনন্দে ভয় পায়। বুঝতে পারে না, কেউ নিজের সঙ্গে এটা কেন করবে! তারা দ্বিধান্বিত হয়, কিন্তু মনে মনে একই কাজ করার কথা ভাবে।

তখন বুঝতে পারবেন, মানুষের মনে আপনি এমন এক চিন্তার বীজ বুনছেন, যা আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। অনুভূতি তো অনুভূতিই। চিন্তা তো চিন্তাই।

ঠিক যখন মনে করবেন আপনি আবার একা, তখন দেখবেন ক্যাফের ওপারে আরেকজন ‘উদ্ভট লোক’ একা বসে আছে—কোনো ডিজিটাল কোলাহল ছাড়াই। সে টেবিলের নিচে ক্রোয়াসোঁ-আকৃতিতে (Croissant) ঘুমিয়ে থাকা আপনার কুকুরের দিকে তাকিয়ে আছে। সে মুহূর্তটা উপভোগ করছে, আর আপনার কুকুর তার দ্বিতীয় স্বপ্নে হয়তো পাশ ফিরছে।

আপনি হাসবেন। জানবেন, আপনি একা নন। দূরত্ব বজায় রেখে এক উদ্ভট লোক সঙ্গ দিচ্ছে অন্য এক উদ্ভট লোককে। জানবেন, এমন অনেকেই আছে।

হয়তো কেউ একজন এটা পড়ে নিজেকে মেলাতে পারছেন। হয়তো কেউ একজন কখনোই এটা দেখবেন না এবং সবসময় একা বোধ করবেন। কিন্তু একবার চারপাশে তাকালেই যথেষ্ট। ক্যাফেতে এক নজর বুলিয়ে হাসিমুখে বেরিয়ে আসুন।

পরদিন আবার গেলাম। এবার ইচ্ছে করেই একটা ‘মনোযোগ সরানোর অনুষঙ্গ’ সঙ্গে নিলাম। তবে সেটা একটা ভালো অনুষঙ্গ।

কোনো ডিজিটাল বিভ্রান্তি ছাড়া ক্যাফেতে একা বসা তখনই আরও আনন্দদায়ক হয়, যখন লেখার কিছু থাকে। তবে কীবোর্ড দিয়ে নয়। লিখতে হবে এক হাত দিয়ে, দুই হাতে নয়। আদর্শত কাগজে-কলমে।

কলম আপনাকে ধীরস্থির করতে চায়। কথাগুলো চিন্তা বা কথা বলার গতিতে কাগজে ঝরে পড়া উচিত নয়।

লিখতে লিখতে কবজি বা হাতে ব্যথা হওয়া চাই। এই ব্যথাটাই বোঝায় যে আপনি যথেষ্ট লিখেছেন। সেটা হতে পারে পাঁচ লাইন, কিংবা এক হাজার।

তাতে কিছু যায় আসে না।

বিরতি নিন।

প্রাসঙ্গিক